
নিজস্ব সংবাদদাতা
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে শেরপুর, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলায় উচ্চমানের সুগন্ধি ও পোলাওয়ের চাল উৎপাদিত হয়, তবুও কেন পোলাও চালের কেজি ১৮০-২০০ টাকা এই ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন এর সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ, তিনি বলেন শেরপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী তুলসীমালা চাল শুধু দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিতি লাভ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে চাল আমাদের দেশেই উৎপাদিত হয়, সেই চালের দাম কেন বাজারে প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে?
প্রথমেই জানা দরকার, বাংলাদেশে সাধারণত পোলাওয়ের জন্য ব্যবহৃত সুগন্ধি চালের বড় অংশ দেশেই উৎপাদিত হয়। যদিও কিছু বিশেষ জাতের বাসমতি বা প্রিমিয়াম চাল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়, কিন্তু তুলসীমালা, কালিজিরা, চিনিগুঁড়া, কাটারিভোগসহ অধিকাংশ পোলাওয়ের চাল দেশীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির পেছনে শুধু আমদানির অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়।
শেরপুরে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও বাজারে দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হলো সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য। কৃষক যে দামে ধান বা চাল বিক্রি করেন, ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেই দামের সঙ্গে একাধিক স্তরে মুনাফা যোগ হয়। অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুতদারি এবং বাজারে সীমিত সংখ্যক ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণও দাম বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দেশের চালের বাজারে উৎপাদন ও মজুদ পর্যাপ্ত থাকার পরও খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ার বিষয়টি বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে।
আরেকটি বড় কারণ হলো ব্র্যান্ডিং। বর্তমানে অনেক কোম্পানি তুলসীমালা বা সুগন্ধি চালকে আকর্ষণীয় প্যাকেটে বাজারজাত করে। একই চাল খোলা বাজারে যে দামে বিক্রি হয়, প্যাকেটজাত অবস্থায় তার মূল্য ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হয়ে যায়। পরিবহন, প্যাকেজিং, বিপণন ও কর্পোরেট মুনাফার ব্যয়ও শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই চাপানো হয়।
এছাড়া জ্বালানি, পরিবহন, শ্রমিক মজুরি ও অর্থায়ন ব্যয় বৃদ্ধিও খাদ্যপণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, উৎপাদন ভালো হওয়া এবং পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও বাজারে দাম না কমা বাংলাদেশের খাদ্যবাজারে দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। সাম্প্রতিক সময়েও দেখা গেছে, চাল আমদানি বৃদ্ধি এবং ভালো ফলনের পরও খুচরা বাজারে চালের দাম প্রত্যাশিতভাবে কমেনি।
সমাধান কী?
প্রথমত, কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরাসরি বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কৃষক সমবায় বা সরকারি বিপণন কেন্দ্রের মাধ্যমে তুলসীমালা চাল সরাসরি বাজারজাত করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে।
দ্বিতীয়ত, সুগন্ধি চালের বাজারে নিয়মিত নজরদারি এবং মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তৃতীয়ত, তুলসীমালা চালের জন্য ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) স্বীকৃতির পূর্ণ সুবিধা নিশ্চিত করে উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে, যাতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পান এবং ভোক্তাও যুক্তিসঙ্গত দামে চাল কিনতে পারেন।
চতুর্থত, স্থানীয় উৎপাদন, মজুদ ও বাজারদরের তথ্য প্রকাশ্যে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির সুযোগ কমবে।
বাংলাদেশে পোলাওয়ের চালের সংকট নেই; সংকট রয়েছে বাজার ব্যবস্থাপনায়। শেরপুরের মাঠে যদি তুলসীমালার সুবাস ছড়িয়ে থাকে, তবে সেই চাল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন, আবার ভোক্তাও সহনীয় দামে চাল কিনতে পারবেন—এমন ভারসাম্যপূর্ণ বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।
