
সবুজ আচার্য্য, চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি
প্রান্তিক পর্যায়েও মিলছে অনলাইন জিডির সুফল
এখন ঘরে বসেই করা যচ্ছে সাধারণ ডায়েরি বা জিডি। বাংলাদেশ পুলিশের আধুনিকায়ন এবং সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন আর সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করার জন্য থানায় গিয়ে সময় ব্যয় করতে হচ্ছে না। স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে পুলিশি সেবাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হয়েছে।
রাজধানীর ৫০টি থানার পাশাপাশি এখন সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চালু হয়েছে এই জিডি কার্যক্রম। ফলে স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে যেকোনো নাগরিক যেকোনো স্থান থেকে নামমাত্র সময়েই তাদের অভিযোগ বা হারানো সংবাদ পুলিশকে জানাতে পারছে।
গত বছরের আগস্ট মাস থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সব থানায় পরীক্ষামূলক ও পূর্ণাঙ্গভাবে অনলাইন জিডি সেবা শুরু হয়। শুরুতে এটি কেবল রাজধানীতে সীমাবদ্ধ থাকলেও সরকারের আইসিটি বিভাগ ও বাংলাদেশ পুলিশের যৌথ প্রচেষ্টায় এখন এটি সারা দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের থানাগুলোতেও কার্যকর হচ্ছে।
এই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য হলো পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘব করা।
ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এই সেবার গুরুত্ব বর্ণনা করে বলেন, ‘অনলাইন জিডির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো মানুষের সময় ও অর্থের সাশ্রয়। আগে একটি সাধারণ জিডি করতেও মানুষকে কর্মস্থল বা ঘর থেকে থানায় যেতে হতো। এখন আপনি আপনার হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে যেকোনো সময় অভিযোগটি পুলিশকে জানাতে পারছেন।
’
পুলিশ সূত্র জানায়, অনলাইনে জিডি করার জন্য কয়েকটি ধাপ রয়েছে। যাঁরা জিডি করতে চান তাঁদের প্রথমে গুগল প্লে-স্টোর থেকে ‘অনলাইন জিডি’ অ্যাপটির মাধ্যমে এই সেবা নিতে হয়। অ্যাপটি ওপেন করার পর প্রথমেই নিবন্ধনের অপশন আসে। জালিয়াতি রোধে এখানে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ব্যবহারকারীকে তাঁর এনআইডি নম্বর এবং জন্মতারিখ দিতে হবে।
সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্বাচন কমিশনের তথ্যভাণ্ডার থেকে তথ্য যাচাই করে নেবে। নিবন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো আবেদনকারীর ছবি যাচাই। এনআইডির ছবির সঙ্গে বর্তমান চেহারার মিল দেখার জন্য ব্যবহারকারীকে একটি লাইভ ছবি তুলতে হয়। এর ফলে একজনের নামে অন্য কেউ জিডি করার সুযোগ পায় না। ছবি যাচাইয়ের পর মোবাইল নম্বর ও একটি পাসওয়ার্ড সেট করতে হবে। এরপর একটি ডিজিটাল স্বাক্ষর দিতে হবে, যা জাতীয় পরিচয়পত্রের স্বাক্ষরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। সবশেষে মোবাইল নম্বরে আসা ওটিপি কোড দিয়ে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। একবার নিবন্ধিত হলে ব্যবহারকারী তার ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করতে পারেন।
অনলাইন জিডি পোর্টালে অভিযোগের ধরনগুলোকে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে ভাগ করা হয়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান। ‘হারানো’ অপশনে ক্লিক করে সাইকেল, মোটরসাইকেল, গাড়ি ছাড়াও কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন হারানোর অভিযোগ দেওয়া যাবে। জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, জন্ম সনদ, শিক্ষার্থী আইডি কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ব্যাংকিং কাগজপত্র, চেকবই, ট্রেড লাইসেন্স, পেনসন বই, বীমার কাগজ এমনকি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন কার্ড বা মার্কশিটসহ ৬৯ ধরনের কাগজপত্রের অপশন এখানে রয়েছে। এ ছাড়া পোষা প্রাণী, চাবি, ব্যাগ, মানিব্যাগ, স্বর্ণালংকার বা নগদ টাকা হারানোর তথ্যও এখানে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। যদি কোনো নাগরিক তাঁর পাসপোর্ট হারান, তবে তাঁকে অ্যাপের সংশ্লিষ্ট ঘরে পাসপোর্টের ধরন, ইস্যুকারী দেশ এবং পাসপোর্ট নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হয়। এরপর ঘটনার স্থান, সময় এবং বিস্তারিত বিবরণ লিখে নিজের জন্য নাকি অন্যের হয়ে জিডি করছেন তা নিশ্চিত করে সাবমিট করতে হবে।
সূত্র জানায়, অনলাইন জিডি করার পর একটি ইউনিক ট্র্যাকিং কোড বা কিউআর কোড যুক্ত জিডি কপি জেনারেট হয়। ব্যবহারকারী চাইলেই এটি পিডিএফ আকারে ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে নিতে পারেন। এই ডিজিটাল কপিটি আইনি কাজে বৈধ হিসেবে গণ্য হয়। অনলাইন জিডি সেবাটি এখন আর কেবল ঢাকা শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের থানাগুলো থেকেও নাগরিকরা এই সুবিধা পাচ্ছেন। শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) রওনক জাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শরীয়তপুরে অনেক আগেই এই সেবা চালু হয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত হচ্ছে। এতে থানার ওপর চাপ কমছে এবং আমরা স্বচ্ছতার সঙ্গেজ কাজ করতে পারছি।’
